মেনু নির্বাচন করুন
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে শিবালয়

শিবালয় উপজেলার

মুক্তিযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 

            রাজধানী শহর ঢাকার অদুরে বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার ‘‘শিবালয় উপজেলা’’নদীবিধৌত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নদী পদ্মা ও যমুনার পাড় ঘেষে অবস্থিত। এই উপজেলার বুক চিরে চলে গেছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। মহাসড়কের দক্ষিণ ধার দিয়ে উপজেলার অধিকাংশ অধিবাসিদের বসবাস। ১৯৭১ সালে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উজ্জিবীত হয়ে শিবালয় উপজেলার ছাত্র জনতা তরে তরে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যার বহির্প্রকাশ। ২৫ মার্চ ঢাকা আক্রমণের পরপরই মুক্তিগামী ছাত্র জনতা স্বঃতস্ফুর্তভাবে আরিচায় নৌ-পথের উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে সকল প্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।

৮’এপ্রিল/১৯৭১ মানিকগঞ্জ (মহুকুমা শহর) পতনের পর অবসর প্রাপ্ত ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর নেতৃত্বে শিবালয় উপজেলার ঘোনাপাড়া গ্রামে (মিয়া বাড়ী) ঘাটি গেরে মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হতে থাকে। জুন মাসের মাঝামাঝি মালুচী, ঘোনাপাড়া ও বাউলীকান্দা গ্রামের কিছু যুবতী মেয়েদের অভিভাবকসহ হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকাররা ধরে নিয়ে আরিচা পাকসেনা ক্যাম্পের দিকে নৌকা যোগে রওয়ানা হয়। ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে সংবাদটি পৌঁছে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা এলাকাবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে পথিমধ্যে আলীনগর (পাল বাড়ী) নামক স্থানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রতিরোধের মুখে পাকবাহিনীর দোসর রাজাকাররা মেয়েদের রেখে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায়। এটাই ছিল মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিগামী জনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ।

            ২৭’জুন/১৯৭১ আরম্নয়া ইউনিয়ন কাউন্সিলে শিবালয় থানার সহকারী দারোগা মোঃ রফিক এর নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ অবস্থান করে, গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ-খবর দিতে থাকে। ইতোমধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা খবর পেয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিল আক্রমণ করে। এ আক্রমণে ঢাকা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সাব-সেক্টর কমান্ডার (এরিয়া কমান্ডার) অবঃ ক্যাপ্টেন আঃ হালিম চৌধুরী স্বয়ং নেতৃত্ব দিয়ে নিজ হাতে রাইফেল দ্বারা গুলি করে দারোগা রফিককে খতম করে এবং দারোগাসহ অন্যান্য পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারম্নদ হসত্মগত করে। এই কৃতিত্বপূর্ণ অভিযানে সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন ১) জনাব মোঃ এলমেছ আলী, ২) জনাব মোঃ রাকিব উদ্দিন খান, ৩) জনাব কে.এ.বি ছিদ্দিক, ৪) জনাব খন্দকার আব্দুল বাতেন, ৫) জনাব খন্দকার শাহ্ আলম ও ৬) জনাব মোঃ খলিলুর রহমান, নৌকার মাঝি ৭) কিয়াম উদ্দিন ৮) হাসেম উদ্দিন ও ৯) এলমেছ আলী অংশগ্রহণ করে। ঘটনাটির দুই দিন পর পাক সেনারা মালুচী বাজারসহ আশেপাশের গ্রামে অগ্নিসংযোগ করে এবং ঘোনাপাড়া আঃ মজিদ খান সাহেবের বাড়ী (মিয়া বাড়ী) সম্পূর্ণরূপে জ্বালিয়ে দেয় ও বহু লোককে হত্যা করে।

            ৭’সেপ্টেম্বর/১৯৭১ আরিচায় অবস্থিত পাক সেনারা লঞ্চ ও গানবোর্ড যোগে মালুচী স্কুলের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সাব-এরিয়া কমান্ডার প্রিন্সিপাল আব্দুল রউফ খান সাহেবের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর পাক-হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

            ৮’ডিসেম্বর/১৯৭১ সকাল ৮:০০ ঘটিকায় সবে মাত্র নালী এবং রূপসা ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা খাবার খেতে বসেছে। ইতোমধ্যে খবর এল গোয়ালন্দ ঘাট থেকে নৌকা যোগে পাক সেনারা পাটুরিয়া ঘাট হয়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের দিকে আসছে। মুহুর্তের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধারা নিজ নিজ হাতিয়ার নিয়ে প্রতিরোধের নিমিত্তে বেরিয়ে পরে। শুরু হল প্রচন্ড গোলাগুলি। এই যুদ্ধে অস্ত্রসহ ৯ জন পাক সেনা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং কিছু মারা যায়। যুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিল মাহফুজ ও ডেলটা কোম্পানী অংশগ্রহণের মাধ্যমে। মাহফুজ কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন মোঃ রেজাউর রহমান খান (জানু) এবং ডেলটা কোম্পানীর কমান্ডার ছিলেন মোঃ মুসলিম উদ্দিন।

            ৯’ডিসেম্বর/১৯৭১ সকালে পলায়নরত পাক সেনাদের ফেরী যোগে দাশকান্দি হয়ে আরিচা ঘাট দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ায় গোপন সংবাদ নালী এবং রূপসা ক্যাম্পে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা পায়। আশেপাশে অবস্থানরত অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে পাক সেনাদের ফেরী লক্ষ করে দাশকান্দিতে (এলাচিপুর) আক্রমণ চালায়। প্রায় ২ ঘন্টা প্রচন্ড গোলাগুলির পর পাক সেনারা পানিতে ডুবে মারা যায় এবং কিছু আহত হয়। প্রকাশ থাকে যে, এই যুদ্ধে আকাশ পথে মিত্র বাহিনীও অংশগ্রহণ করে।

            ১০’ডিসেম্বর/১৯৭১ মোল্লা বাড়ীর যুদ্ধটি সংগঠিত হয়েছিল মূলত বি.এল.এফ (মুজিব বাহিনী) ও পাক সেনাদের সঙ্গে। বি.এল.এফ (মুজিব বাহিনী) সাহসী কমান্ডার জনাব মনসুর উল-আলম খান আরিচা অবস্থিত পাক সেনা ক্যাম্পে আক্রমণ করার লক্ষে ৩৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মোল্লা বাড়ীতে (ইসমাইল হোসেন মোল্লা) গোপন আসত্মানা করে। ৭’ডিসেম্বর/১৯৭১ এই গোপন আসত্মানায় ৩০ জন রাজাকার অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। নাগরপুরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করানোর জন্য এই গোপন আসত্মানা থেকে ২৮০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে নেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের এই গোপন আসত্মানার খবর জানাজানি হয়ে গেলে ১০’ডিসেম্বর/১৯৭১ আরিচার সেনা ক্যাম্প থেকে প্রায় ১৯০ জন পাক সেনা ও ১০০ জন রাজাকার নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এই গোপন আসত্মানায় আক্রমণ চালায়। এই স্বল্পসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে শুরু হলো তুমুল যুদ্ধ। যুদ্ধে কমান্ডার জনাব মনসুর উল-আলম খান আহত হন এবং উকারাম মন্ডল নামে একজন গ্রামবাসী নিহত হন। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ হওয়ার পর পাক সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্য মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন ১) মোঃ মেজবাহ উদ্দিন খান, ২) মোঃ ইমদাদুল হক, ৩) মোঃ জালাল মাষ্টার, ৪) বিপ্লব ও ৫) দুলাল।

চলমান-

ছবি



Share with :
Facebook Twitter